Dhaka University Biochemistry Alumni in North America
প্রথম জিন থেরাপি অনুমোদন: সিকেল সেল অ্যানিমিয়া নিরাময়
Dr. Shamsul Alam
আজকের দিনটি (৮ ই ডিসেম্বর, ২০২৩) চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আজকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (FDA) সিকেল সেল এনিমিয়া এর জন্য প্রথম জিন থেরাপি অনুমোদন দিয়েছে। আজ একই দিনে এ রক্তের ব্যাধি নিরাময়ে ২ টি থেরাপি অনুমোদন পেলো। তন্মধ্যে প্রথমটি হলো Casgevy অথবা Exa-cel, যা যুক্তরাষ্ট্রের Crispr Therapeutics এবং Vertex Pharmaceuticals কোম্পানি যৌথভাবে তৈরী করেছে। আর দ্বিতীয়টি হলো Lyfgenia অথবা Lovo-cel, যা যুক্তরাষ্ট্রের Bluebird Bio নামক একটি কোম্পানির তৈরী। থেরাপি দুটো সম্পর্কে বলার আগে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া নামক রক্তের ব্যাধিটি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।
সিকেল সেল অ্যানিমিয়া:
সিকেল সেল অ্যানিমিয়া হচ্ছে জীবনের হুমকিস্বরূপ একধরণের রক্তের ব্যাধি। আমাদের রক্তে লোহিত রক্ত কণিকা (RBC) নামক এক ধরণের কোষ থাকে। এই কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হিমোগ্লোবিন। এই হিমোগ্লোবিনের সাহায্যে রক্তের লোহিত রক্ত কণিকা শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এখন কোন কোন মানুষ জন্মের সময় হিমোগ্লোবিন জিনের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন (mutation) দেখা যায়, যার ফলে ঐসকল ব্যক্তির লোহিত রক্ত কণিকার বিকৃতি ঘটে এবং সেগুলো শরীরের কোষগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না। সাধারণত ৮/৯ মাস বয়স এর পর থেকে এই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়।
রোগের লক্ষণ:
সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগের লক্ষণ গুলোকে একসাথে Vaso-occlusive events (VOEs) অথবা Vaso-occlusive crises (VOCs) বলা হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে বুকে, পেটে এবং বিভিন্ন জয়েন্ট ব্যথা, স্ট্রোক, শিশুদের দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, শরীরে অত্যধিক ক্লান্তিভাব ও বিরক্তি বোধ করা, হাত-পা ফুলে যাওয়া, কিডনির সমস্যা, চোখে ঝাপসা দেখা, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, হাত-পা ফুলে যাওয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান থেরাপি:
বর্তমানে যেসব থেরাপি প্রচলিত আছে তার মধ্যে স্টেম সেল থেরাপি সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপযুক্ত ডোনার পাওয়া যায় না। এছাড়া লোহিত রক্ত কণিকা প্রদাণ (Red blood cell transfusion) আর তার সাথে ব্যথা কমানোর জন্য Hydorxyurea জাতীয় ওষুধ বহুল প্রচলিত।
এখন নতুন দুটি থেরাপি সম্পর্কে একটু ধারণা দেয়া যাক।
১) Casgevy: এটিতে মূলত CRISPR/Cas9 জিন এডিটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে আক্রান্ত রোগীর রক্তের স্টেম সেল নিয়ে হিমোগ্লোবিনের অস্বাভাবিক mutation টিকে gene editing এর মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় রূপান্তর করে একই রোগীর দেহে ইনজেক্ট করা হয়। এতে স্বাভাবিক লোহিত রক্তকণিকা তৈরী হয়, যা শরীরের বিভিন্ন কোষে স্বাভাবিক ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে।
Crispr Therapeutics এবং Vertex Pharmaceuticals কোম্পানি থেরাপিটি প্রস্তুত করার পর ৩১ জনের উপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করেছে। তন্মধ্যে ২৯ জন এখন পর্যন্ত ট্রিয়ালটি শেষ করেছে। এই ২৯ জনের মধ্যে ২৮ জনেরই থেরাপি নেয়ার ২ বছর যাবৎ রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় নি। আর একজন থেরাপি নেয়ার ৯ মাস পর মারা যায়। অর্থাৎ, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগ নির্মূলে Casgevy এর কার্যকারিতা শতকরা ৯৬ ভাগ।
এখানে উল্লেখ্য যে, CRISPR/Cas9 জিন এডিটিং পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য ২০২০ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী Emmanuelle Charpentier হচ্ছে Crispr Therapeutics কোম্পানির একজন প্রতিষ্ঠাতা।
২) Lyfgenia: এটিও Casgevy এর মতো সেল বেসড থেরাপি। এই ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগীর রক্তের স্টেম সেল নিয়ে লেন্টিভাইরাল ভেক্টর এর সাহায্যে হেমোগ্লোবিনের নরমাল জিনটি প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। তারপর সেই সেল গুলো একই রোগীর দেহে ইনজেক্ট করা হয়। একইভাবে, স্বাভাবিক লোহিত রক্তকণিকা তৈরী হয়, যা শরীরের বিভিন্ন কোষে স্বাভাবিক ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে।
Bluebird Bio কোম্পানি থেরাপিটি প্রস্তুত করার পর ১২-৫০ বছর বয়সী ৩২ জন সিকেল সেল অ্যানিমিয়া রোগীর উপর ক্লিনিকাল ট্রায়াল করেছে। তন্মধ্যে শতকরা ৮৮ ভাগ (২৮ জন) রোগী ৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে আরোগ্য লাভ করে।
এই দুটি থেরাপি অনুমোদনের পর জিন থেরাপি এর নতুন দ্বার উম্মোচিত হলো। বিভিন্ন কোম্পানির পাইপলাইন এ এখন জন্মান্ধতা, থেলাসেমিয়া সহ ক্যান্সার এর জিনথেরাপি প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে জিন থেরাপি আসার আলো দেখালেও একটা দুঃশ্চিন্তা এখনো রয়ে গেলো। আর সেটা হলো জিন থেরাপি এর খরচ, যা শুনলে চোখ কপালে ওঠার অবস্থা হতে পারে।
সিকেল সেল অ্যানিমিয়া নির্মূলে Casgevy থেরাপি তে একজন রোগীর খরচ হবে প্রায় ২.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৫ কোটি টাকা), আর Lyfgenia থেরাপিতে খরচ হবে প্রায় ৩.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫ কোটি টাকা)। তবে যদিও এটি অনেক ব্যয়বহুল এটির খরচ কমানোর জন্য কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যায় শীঘ্রই চিকিৎসাব্যয় কমানোর উপায় বের হবে।
